ক্লিওপেট্রা মিশরীয় ছিলেন না, রইল আরো অজানা রহস্

প্রযুক্তি ডেস্ক :

মিশরীরা ইতিহাসের একটা অংশ দখল করে রয়েছে। মিশরীয় সভ্যতার সম্পদ, জীবনযাপন, নীলনদ, পিরামিড, মমি পুরো মিশরকে করেছে সমৃদ্ধ। হাজারো বছর আগে কীভাবে তারা এতোটা সমৃদ্ধশালী ছিল তাও এখনো অজানা।

তবে আধুনিক বিজ্ঞানের বদৌলতে মিশরের অনেক কিছুই উম্মোচিত হয়েছে।তারপরও এখনো অজানা আছে অনেক কিছুই। মিশর নিয়ে করা ধারাবাহিকে আগের পর্বগুলোতে ছিল প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা, তাদের জীবন ধারণ, পিরামিড, মমি নিয়ে। আজ থাকছে মিশরের অজানা আরো কিছু দিক নিয়ে। যা বেশ চমকপ্রদও বটে। চলুন জেনে নেয়া যাক সেসব-

ক্লিওপেট্রা

ক্লিওপেট্রা

ক্লিওপেট্রা মিশরীয় ছিলেন নামিশরের রানি ক্লিওপেট্রার নাম শোনেননি এমন কাউকেই বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। রূপে ও গুণে তিনি ছিলেন অনন্যা। তবে রূপের জন্যই বেশি সমাদৃত হয়েছিলেন। তার রূপ দেখে তৎকালীন সবাই মুগ্ধ হয়েছেন। সব কিছু উজার করে দিয়ে হলেও পেতে চেয়েছেন রানিকে। সেসময়কার আশেপাশের রাজ্য এবং দেশের রাজারা ক্লিওপেট্রার প্রেমে পাগল ছিলেন।

মিশরের নারী ফারাওদের মধ্যে ক্লিওপেট্রা ছিলেন অন্যতম একজন শাসক। তবে জানেন কি? তিনি কিন্তু মিশরীয় ছিলেন না। অবাক হচ্ছেন, তাহলে তিনি মিশরের ফারাও কীভাবে হয়েছিলেন? ক্লিওপেট্রা নামে পরিচিত ছিলেন টলেমিক মিশরের সর্বশেষ সক্রিয় ফারাও। তার রাজত্বের পর, মিশর তৎকালীন সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত রোমান সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। ক্লিওপেট্রা ছিলেন প্রাচীন মিশরীয় টলেমিক বংশের সদস্য।

সুন্দরী ক্লিওপেট্রা

সুন্দরী ক্লিওপেট্রা

আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর মহামতি নামে তার একজন সেনাপতি মিশরে কর্তৃত্ব দখল করেন। তিনিই টলেমিক বংশের গোড়াপত্তন ঘটান। এই বংশের বেশিরভাগ সদস্য গ্রিক ভাষায় কথা বলতেন। তারা মিশরীয় ভাষা শিখতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে রোসেত্তা স্টোনের সরকারি নথিপত্রেও মিশরীয় ভাষার পাশাপাশি গ্রিক ভাষার প্রচলন ছিল।অপরদিকে ব্যতিক্রমী ক্লিওপেট্রা মিশরীয় ভাষা শিখেছিলেন। তিনি নিজেকে একজন মিশরীয় দেবীর পুনর্নজন্ম হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
তার পিতা চতুর্দশ টলেমি অলেটেসের সঙ্গে তিনি দ্বৈতভাবে মিশর শাসন করতেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি তার ভাতৃদ্বয় ত্রয়োদশ টলেমি ও চতুর্দশ টলেমির সঙ্গে রাজ্য শাসন করতেন। তৎকালীন মিশরীয় ঐতিহ্য অনুসারে, তিনি নিজের ভাইদেরকে বিয়েও করেছিলেন। পরবর্তীতে একসময় ক্লিওপেট্রা মিশরের একক শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। ফারাও হিসেবে তিনি রোমের শাসক গাউস জুলিয়াস সিজারের সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। যা মিশরের সিংহাসনে ওপর তার হাতকে আরো শক্তিশালী করেছিল।

তারা বোর্ড খেলত

তারা বোর্ড খেলত

মিশরীয়রাই প্রথম শান্তিচুক্তি করেছিলদুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে। মিশরীয়রা আধুনিক সিরিয়ায় ভূমির নিয়ন্ত্রণের জন্য হিট্টাইট সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। এই দ্বন্দ্বের জন্যই খ্রিস্টপূর্ব ১২৭৪ খ্রিস্টাব্দে কাদেশের যুদ্ধের মতো রক্তাক্ত যুদ্ধ হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় ফেরাউন রামিসের সময় উভয় পক্ষই বেশ প্রভাবশালী ছিল। মিশরীয় এবং হিট্টিয়ান উভয়ই একে অন্যের দলের লোকদের হুমকি এবং হত্যা করত

খ্রিস্টপূর্ব ১২৫৯ সালে দ্বিতীয় রামিস এবং তৃতীয় রাজা হট্টুসিলি একটি বিখ্যাত শান্তি চুক্তি করেন। এই চুক্তি দ্বন্দ্বের অবসান ঘটায় এবং তৃতীয় পক্ষের আক্রমণে দুটি রাজ্য একে অপরকে সহায়তা করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় হয়। মিশর-হিট্টিট চুক্তিটি এখন পর্যন্ত পৃথিবীর প্রথম শান্তি চুক্তি হিসেবে স্বীকৃত। এর একটি অনুলিপি নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘের সুরক্ষা কাউন্সিল চেম্বারের প্রবেশদ্বার উপরে রাখা আছে।

নারীরা ছিলেন স্বাধীন

নারীরা ছিলেন স্বাধীন

মিশরীয়রা বোর্ড খেলতে ভালোবাসতেননীল নদ থেকে পানি নিয়ে কৃষিকাজ, দালানকোঠাসহ পিরামিড নির্মাণ ইত্যাদি করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিল মিশরবাসী। নিজেদের মানসিক স্বস্তির জন্য তারা বোর্ড খেলা শুরু করে। সেনেট নামে পরিচিত এই খেলা সেসময় বেশ জনপ্রিয় ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অবধি প্রায় ৩০ স্কোয়ার ফিট আঁকা একটি দীর্ঘ বোর্ডে খেলা হত।

প্রতিটি খেলোয়াড়ের এক সেট গুটি ছিল। যা বোর্ডের পাশ দিয়ে ডাইসের রোলে সাজানো থাকত। এই খেলা শুধু যে পুরুষরাই খেলতেন তা কিন্তু নয়। নারীরাও এ খেলায় বেশ পারদর্শী ছিলেন। রানি নেফেরতারিও সেনেট খেলতে পছন্দ করতেন। তুতানখামেনের মতো ফারাওদের সমাধিতে গেম বোর্ডগুলো সমাহিত করা হয়েছিল।

শ্রমিক আন্দোলন ঘটে

শ্রমিক আন্দোলন ঘটে

মিশরীয় নারীরা ছিলেন স্বাধীনপ্রাচীন মিশর থেকেই নারীরা পুরুষের পাশাপাশি বেশ স্বাধীন জীবনযাপন করেছে। তারা আইনী এবং আর্থিক দিক থেকেও ছিলেন স্বাধীন। তারা সম্পত্তি কেনা বেচা করতে, জুরিতে সেবা দিতে, উইল করতে এবং এমনকি আইনি চুক্তিতেও হস্তক্ষেপ করতে পারত। মিশরীয় নারীরা সাধারণত বাড়ির বাইরে কাজ করতেন না। বাড়ির বাইরের বাগানের দেখাশুনা করতেন তারা।

তবে নিচু শ্রেণির অনেক নারীরাই (পিরামিড তৈরি কিংবা নির্মাণাধীন কাজে) পুরুষদের মতো একই কাজ করে সমান বেতন পেতেন। প্রাচীন গ্রিসের নারীদের মতো নয়, মিশরীয় নারীরা তাদের স্বামীর সম্পত্তির মালিকানাধীন ছিল। তাদের বিবাহবিচ্ছেদ এবং পুনরায় বিবাহ করার অধিকার ছিল। এমনকি মিশরীয় দম্পতিরা একটি প্রাচীন প্রাক-পূর্ব চুক্তি মেনে চলত। এই চুক্তিতে নারীরা বিবাহবিচ্ছেদ হলে ক্ষতিপূরণ পেতেন।

মিশরীয়রা ছিলেন স্বাস্থ্যবান

মিশরীয়রা ছিলেন স্বাস্থ্যবান

মিশরীয়রাই প্রথম শ্রমিক আন্দোলন করেছিলমিশরীয়রা ফেরাউনকে তাদের জীবন্ত দেবতা হিসেবে গণ্য করত। তবে তারা উন্নত কাজের অবস্থার জন্য প্রতিবাদ করতে ভয় পেত না। খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীতে নিউ কিংডম ফেরাউন রামিসেসের রাজত্বকালে ঘটে যায় প্রথম শ্রমিক আন্দোলন। দেইর এল-মদিনায় রাজকীয় নেক্রোপলিস তৈরিতে নিযুক্ত শ্রমিকরা তাদের শস্যের যথাযথ অর্থ না পাওয়াই ধর্মঘট করে। যা ছিল ইতিহাসের প্রথম রেকর্ডকৃত শ্রমিক ধর্মঘট। এই বিক্ষোভ বেশ খারাপ রূপ নিয়েছিল। আর এ কারণেই শ্রমিকরা তাদের দাবি এবং অর্থ আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি এই আন্দোলনের জন্য তারা রেশন সুবিধাও আদায় করে নিয়েছিল।

মেকআপ ব্যবহার করতেন পুরুষরা

মেকআপ ব্যবহার করতেন পুরুষরা

মিশরীয়রা ছিল বেশ স্বাস্থ্যবানপ্রাচীন মিশরীয় মূর্তিগুলো দেখলেই বোঝা যায় তাদের দৈহিক আকৃতি সম্পর্কে। তারা বেশ স্থূলাকার ছিল। বিয়ার, ওয়াইন, রুটি এবং মধু ছিল তাদের প্রিয় খাবার। এমনকি তারা মিষ্টি জাতীয় খাবার বেশি খেত। ফলে শরীরের ওজনও বেড়ে যেত সহজেই।

তাদের মমি পরীক্ষা করে বোঝা যায়, অনেক মিশরীয় শাসক অস্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য অতিরিক্ত ওজনযুক্ত ছিলেন। এমনকি বেশিরভাগ মিশরীয় শাসক জীবদ্দশায় ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। রানি হাতসেপসুত, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ১৫ শতাব্দীতে বেঁচে ছিলেন। তার মমি পরীক্ষা করে দেখা যায় তিনিও বেশ স্থূলাকার ছিলেন।

দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে তারা মেকআপ করতেন

দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে তারা মেকআপ করতেন

মিশরীয় নারী পুরুষ উভয়েই মেকআপ ব্যবহার করতেনসাধারণত মেকআপ বা সাজ সজ্জার উপকরণগুলো নারীরাই বেশি ব্যবহার করে। তবে জানেন কি? মিশরীয়রা নারী পুরুষ সবাই ব্যবহার করতেন মেকআপ। তারা বিশ্বাস করতেন, মেকআপ করলে তাদের দেবদেবী তাদের সুরক্ষা দিবেন। তাদের প্রসাধনীগুলো মালহাইট এবং গ্যালেনার মতো আকরিক মিশিয়ে তৈরি করা হত। এখনকার মতো তখন মেকআপ ব্রাশ ছিল না। তাই কাঠ, হাড় এবং হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি বিভিন্ন আকৃতির পাত্র দিয়ে এগুলো চোখের চারপাশে ব্যবহার করা হত।

নারীরা লাল রঙের দাগ কাটতেন গালে। তাদের হাত এবং নখ রঙিন করতেন মেহেদি ব্যবহার করে। নারী ও পুরুষরা তেল, মরিচ এবং দারুচিনি দিয়ে তৈরি আতর মাখতেন শরীরে। মিশরীয়রা বিশ্বাস করত তাদের মেকআপে যাদুকরী নিরাময় ক্ষমতা রয়েছে। তবে একথা কিন্তু সম্পূর্ণ ভুল ছিল না। গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে, তারা যে সীসাভিত্তিক প্রসাধনী ব্যবহার করত তা আসলে চোখের সংক্রমণ দূর করতে সহায়তা করত।

দক্ষ শ্রমিক দিয়ে পিরামিড তৈরি করা হত

দক্ষ শ্রমিক দিয়ে পিরামিড তৈরি করা হত

পিরামিড দাসদের দিয়ে তৈরি হয়নিজানলে আশ্চর্য হবেন বৈকি! হাজারো বছর আগের তৈরি পিরামিডগুলোর নির্মাণ ছিল সুপরিকল্পিত। একদম দক্ষ আর জ্ঞানী গুণী স্থাপত্যশিল্পীদের দিয়ে তৈরি হয় পিরামিডের নকশা। অনেকে বলেন সাধারণ শ্রমিকদের দিয়েই রাজার মন মতো তৈরি করা হয়েছিল পিরামিড। তবে এই যুক্তি মানতে নারাজ ইতিহাসবিদ আর গবেষকরা। তারা মনে করেন, অনেক পরিকল্পনা এবং পরীক্ষা নিরিক্ষার পর তৈরি হয়েছিল পিরামিড। তা পিরামিডের নকশা আর ভেতরের আকার আকৃতি দেখলেই বোঝা যায়।

চিকিৎসা ব্যবস্থা

চিকিৎসা ব্যবস্থা

মিশরীয়রা বিভিন্ন পশুপাখি পুষতমিশরীয়রা প্রাণীকে দেবতার অবতার হিসেবে দেখত। তাই এগুলোকে যত্ন নিয়ে লালন পালন করত তারা। বিড়াল মিশরীয়দের সবচেয়ে প্রিয় পোষ্য ছিল। এছাড়াও বাজপাখি, ইবিস, কুকুর, সিংহ, বানর ছিল তাদের পোষ্যের তালিকায়। এগুলোকে নিজেদের মতো করে বিভিন্ন কাজের প্রশিক্ষণ দেয়া হত। মৃত্যুর পর মনিবের সঙ্গেই সমাধি বা মমি করা হত। জানেন কি? এখনকার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর যেমন ডগ স্কোয়াড রয়েছে তেমনি মিশরীয়দের ছিল বানর স্কোয়াড।

মিশরীয়দের ছিল উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা

মিশরীয়দের চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল খুবই উন্নত। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ সালের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। তার লেখায় মিশরীয় ওষুধ নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। তিনি লিখেছেন প্রতিটি চিকিৎসক ছিল খুবই মেধাবী। আর একেক রোগের জন্য বিখ্যাত। তাদের চোখ, দাঁত এবং পেটের চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল সবচেয়ে ভালো। যা এখনো চিকিৎসা শাস্ত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়তা করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *