যশোরে ৭ টন ভেজাল টিএসপি জব্দ

যশোর প্রতিনিধি :

দীর্ঘ সাত মাস পর্যবেক্ষণ শেষে বিপুল পরিমাণ ভেজাল টিএসপি সার জব্দ করেছে যশোর কৃষি বিভাগ। রবিবার (১ আগস্ট) ভোর রাতে সদর উপজেলার ছোট শেখহাটি গ্রামে অভিযান চালিয়ে আটা, ময়দা ও মসুর ডাল লেখা বস্তায় ভরে বাজারজাত করা এই অপদ্রব্য উদ্ধার করেন সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন দুইটি টিম।

এ সময় মূলহোতা প্রিন্স অল্পের জন্যে পালিয়ে যান। আগে থেকে গা ঢাকা দেন তার আরেক সহযোগী নেছার আলী। এ সময় ভেজাল সার নিয়ে যাওয়া তিন নসিমন চালককে আটক করা হয়। পরে মালিককে ধরিয়ে দেওয়ার শর্তে তাদের ছেড়ে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

সাত মাসের মাথায় ভেজাল টিএসপি জব্দ করাকে সাফল্য হিসেবে দেখছে কৃষি বিভাগ।

আমন মৌসুমকে সামনে রেখে যশোরে ভেজাল সার কারবারিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এতোদিন ভেজাল দস্তা এবং পটাশিয়াম সারের নামে অপদ্রব্য বাজারজাত করতো একটি চক্র। কিছুদিন ধরে সদর উপজেলার ছোট শেখহাটি গ্রামে প্রিন্স ও নেছার আলী নামে দুই ব্যক্তি ভেজাল টিএসপি সার তৈরি করে আসছিলেন।

গত সাত মাস আগে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন সাজ্জাদ হোসেন। যোগদান করার পরপরই তার কাছে ভেজাল টিএসপি সার তৈরি করার খবর যায়। সেই থেকে তিনি পর্যবেক্ষণে রাখেন প্রিন্স-নেছার আলী চক্রকে। কিন্তু প্রমাণ পাচ্ছিলেন না। সর্বশেষ, রোববার ভোররাতে খবর পান বিপুল পরিমাণ ভেজাল টিএসপি সার নসিমনযোগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সাথে সাথে দুইটি টিম নিয়ে অভিযানে বের হন তিনি। দুইদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয় প্রিন্সের বাড়ি। অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে প্রিন্স পালিয়ে যান। সেখানে গিয়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা দেখেন একটি টিনের ছাপড়া ঘরে বিপুল পরিমাণ ভেজাল টিএসপি ও এটি তৈরির কাঁচামাল রয়েছে। একইসাথে তিনটি নসিমনে ভরে এই অপদ্রব্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

তখন কৃষি বিভাগ সূর্যমুখী আটা, ময়দা ও মসুর ডাল লেখা বস্তায় ভরা ৫০ কেজি ওজনের ১শ’ ১৫ বস্তা ভেজাল টিএসপি (প্রায় ছয় টন), ২০ বস্তা ম্যাগনেসিয়াম সালফেট, পাঁচ বস্তা বোরিক এসিড, এক টন কাঁচামাল ও ভেজাল টিএসপি তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করে। আটক করা হয় তিন নসিমনচালককে।

এই ভেজাল টিএসপি কী দিয়ে তৈরি করা হচ্ছিল- এমন প্রশ্নের জবাবে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন জানান, চুন, বোরিক এসিড এবং টাইলসের গুঁড়ো দিয়ে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে এটি তৈরি করছিল। তারা টিএসপি হিসেবে বাজারজাত করতো। প্রশাসনের লোকজন যাতে বিষয়টি বুঝতে না পারে এ কারণে সূর্যমুখী আটা, ময়দা ও মসুর ডালের ৫০ কেজির বস্তায় ভরে এই অপদ্রব্য বাজারজাত করছিল চক্রটি।

তিনি জানান, দীর্ঘ সাত মাস ধরে চক্রটিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। কিন্তু প্রমাণ মিলছিল না। রোববার ভোরে সংবাদ আসে, নসিমনে করে ভেজাল টিএসপি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খবর শুনে ফজরের নামাজ শেষে সেখানে অভিযান চালানো হয় বলে জানান কৃষি অফিসার সাজ্জাদ হোসেন। এটিকে বিরাট সাফল্য হিসেবে দেখছেন তারা। অভিযানে তার সাথে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শেখ নুরুল্লাহ, প্লান্ট প্রোটেকশন মোকাদ্দম আব্দুল হাফিজসহ অন্যান্যরা অংশ নেন।

কৃষি অফিসার বলেন, ভেজাল সার কারবারিরা ‘ভূমি খুনি’। তারা আমাদের উর্বর জমিগুলো অপদ্রব্য দিয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অথচ এই ভূমি আমাদের খাদ্য যোগাচ্ছে। এসব ভেজাল সার কারবারির বিরুদ্ধে খুনের মামলা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাজ্জাদ হোসেন জানান, গত সাতমাসে তিনটি ভেজাল সার কারখানায় অভিযান চালিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোতে পর্যায়ক্রমে অভিযান চালানো হবে। কোনোভাবেই ‘ভূমি খুনিদের’ ছাড় দেওয়া হবে না।

এদিকে, আটক তিন নসিমনচালককে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম মুনিম লিংকনের কাছে হাজির করে কৃষি বিভাগ। সেখানে নসিমন চালকদের ভেজাল কারবারি প্রিন্সকে ধরিয়ে দেওয়ার শর্তে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম মুনিম লিংকন বলেন, ‘যেহেতু লেবারদের ধরা হয়েছিল, সেই কারণে বিকেলের মধ্যে মালিক অথবা ম্যানেজারকে হাজির করার শর্তে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সর্বশেষ, সন্ধ্যার একটু আগে মালিক প্রিন্সকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করেন নসিমন চালকরা। তখন আদালত তাকে এক মাসের কারাদণ্ড ও দুই হাজার টাকা জরিমানা করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *